১.
কথায় আছে, বিপদে বন্ধু চেনা যায়। করোনায় শুধু যে বন্ধু চেনা যাচ্ছে তা না, মানুষ-অমানুষের পার্থক্যটাও প্রকট হয়ে ওঠছে। মানুষের অবয়বে জন্মালেই যে মানুষ হওয়া যায় না—কতিপয় দানবের করোনা জাল সার্টিফিকেট-ব্যবসা তথা মৃত্যু নিয়ে খেলার মতো দুর্নীতি দেখলেই ব্যাপারটা পষ্ট হয়। মাস্ক কেলেঙ্কারি, রিজেন্ট কাণ্ড, আইসিউ বিলসহ অন্যান্য মোটাদাগের দুর্নীতিগুলো জাতি হিসেবে ও মানুষ হিসেবে আমাদের অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে। প্রকৃতির নিষ্ঠুর সময়ে মানুষও তার অমানবিকতার রুদ্ররূপ দেখিয়ে যাচ্ছে—এসব খবর প্রায় প্রতিদিনই গণমাধ্যমে চাউর হচ্ছে। হরহামেশাই প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোর দিকে চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত করার অভিযোগ ওঠছে। শফিপুরের করোনায় আক্রান্ত সন্দেহে অসুস্থ মাকে তার ছেলেরা  জঙ্গলে ফেলে দেওয়ার মতো অমানবিকতার চূড়ান্তরূপ প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে। করোনায় আক্রান্ত সন্দেহে আরেক প্রতিবন্ধী মহিলাকে পরিবারের সদস্যরা আইসোলেশনের নামে খেতের ঝুপড়িতে অনাহারে রেখেছিল। এক স্বাস্থ্যকর্মীর বাসায় সারা রাত ঢিল ছুড়ে পরিবারসহ তাঁকে এলাকা ছাড়ানোর চেষ্টা করেছিল এলাকাবাসী। এ যেন অমানবিকতার অন্য এক পৃথিবী!

২. 
এত এত বিভৎসতার মাঝেও সম্মুখ করোনাযোদ্ধাগণের নেতৃত্বে আছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। ডাক্তার ও নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা যা করছেন, তা কেবল দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে করছেন বললে তাদের প্রতি যথোপযুক্ত সম্মান দেখানো হবে না এবং অবিচার করা হবে বলে আমার মনে হয়। চেতনা ও নৈতিকতাবোধ না থাকলে কেউ জীবনবাজি রেখে দায়িত্ব পালন করবে না। স্বাস্থ্যকর্মীদের বাইরে করোনাযুদ্ধের অন্যতম সৈনিক পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীগণ। জাতীয় দুর্যোগসমূহে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে সঠিক তথ্য জানাটা ভীষণ জরুরি হয়ে ওঠে। আর এ গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছেন মাঠপর্যায়ের গণমাধ্যমকর্মীগণ। স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ এবং গণমাধ্যমকর্মীসহ সকল পেশার মাঠপর্যায়ের কর্মীগণ অধিক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যেও দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে; কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে যারা মারা যাচ্ছে, তাদের ভাগ্যে কী জুটছে? লাশ নিয়ে অমানবীয় কদাকার ঘটনাগুলোও গণমাধ্যমে প্রতিদিন প্রকাশিত হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মৃতদের দাফনের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত অনলাইন বুলেটিনে জনসাধারণকে সচেতন করতে হয়েছে। ডব্লিউএইচও-র বরাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৃতদেহ দাফন বা সৎকার করতে তিন চার ঘণ্টা সময় লেগে যায়। তিন ঘণ্টা পরে আর মৃতদেহে এই ভাইরাসের কার্যকারিতা থাকে না। আর এ কারণেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কেউ মারা গেলে তাকে স্বাস্থ্য নির্দেশনা মেনে নিজ ধর্ম মেনে সৎকার কিংবা পারিবারিক কবরস্থানেই তাকে দাফন করা যাবে। এতকিছুর পরেও লাশ নিয়ে অমানবিক ঘটনাগুলো বন্ধ হচ্ছে না। এর মধ্যে করোনার শুরুর পর্যায়ে একাত্তর টিভির একটি লাইভ প্রোগ্রামে দেশের মেইনস্ট্রিম একটি পত্রিকার সম্পাদক কোনোরকম বৈজ্ঞানিক রেফারেন্স ছাড়া মৃত লাশকে দাহ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। ইসলামধর্মীয় রীতিনীতিকে পাশ কাটিয়ে কীভাবে তিনি এ কথা বলেন এবং কেনই-বা বলেন, সে-প্রশ্নের উত্তর জানিয়ে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না নিশ্চয়। বলা বাহুল্য, উক্ত সম্পাদকের মতো অসংখ্য সুযোগসন্ধানী এ ধরণের সাম্প্রদায়িক উষ্কানি দিতে উন্মুখ  হয়ে আছে। তাই ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে লাশ দাফন বা দাহ করা নিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জটা আরও গাঢ় হয়ে সামনে আসে।

৩. 
লাশ দাফন নিয়ে সর্বপ্রথম তৎপর হতে দেখা গেছে গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ নামের একটি ধর্মীয় সংগঠনকে। এরপরে আল মানাহিল ফাউন্ডেশন, পাথওয়ে, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, শাবাব ফাউন্ডেশনসহ অনেকগুলো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এ কাজে এগিয়ে এসেছে। তবে আমাকে সবচে’ বেশি বিস্মৃত ও আনন্দিত করেছে গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের কর্মকাণ্ড। এ সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীগণ সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ওঠে হিন্দু-বৌদ্ধসহ অমুসলিম সম্প্রদায়ের লাশ সৎকার বা দাহ করার কাজে নির্বিচ্ছিন্ন সহযোগিতা করে যাচ্ছে—প্রথম আলোসহ দেশের শীর্ষ সারির সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে এ তথ্য জেনেছি। ২৯ জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে গাউসিয়া কমিটির স্বেচ্ছাসেবীরা ৭২২টি লাশ দাফন করেছে—শুধু চট্টগ্রামেই সংখ্যাটি ৫৪০। উপজেলা পর্যায়ে প্রথম কোনো কোভিড ঊনিশ হাসপাতাল গড়ে ওঠেছে আমাদের ফটিকছড়িতে, জনগণের টাকাতে। এ হাসপাতালে বিনাপারিশ্রমিকে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে আমার এলাকার কিছু সংখ্যক তরুণের আগ্রহ দেখে আমি উদ্বেলিত হয়েছি। গাউসিয়া কমিটি ও তেজোদ্দীপ্ত তরুণদের এসব নির্মোহ কাণ্ড দেখে আমি প্রায় অবচেতনে বলে ওঠি, করোনা পরবর্তীতে সুন্দর একটি পৃথিবীর আশা করাটা বোধহয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা হবে না।

৪.
ফটিকছড়ি উপজেলায় গাউসিয়া কমিটির হয়ে দাফনকাজে নেতৃত্বে আছেন ফটিকছড়ি করোনেশন সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের হ্যাড মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাছউদ কাদেরী। করোনেশনে শিক্ষাজীবনের দুই বছর অতিবাহিত করার দরুন তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক। স্বাস্থ্যকর্মীদের নাহয় দায়িত্বশীলতার একটা প্রশ্ন থাকেই, কিন্তু এ-দুঃসময়ে দাফনকাজ পরিচালনা তো ‘ঘরের খেয়ে অন্যের মোষ তাড়ানো’র সামিল। তাঁকে জিগ্যেস করেছিলাম, জীবনঝুঁকি নিয়ে কেন আপনি এসব করছেন! তিনি জানিয়েছেন, “যুদ্ধে কেউ না কেউ এগিয়ে না আসলে যুদ্ধটা করবে কে? দায়িত্বশীলতা নয়, মানবিকতাই বড় বিষয়।” তিনি এক যুগের বেশি সময় ধরে শিক্ষকতা পেশায় আছেন এবং অসংখ্য ছাত্র পড়িয়েছেন। ছাত্রদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং তাঁর প্রতি ছাত্রদের অতলস্পর্শী শ্রদ্ধা তাঁর অনন্য ব্যক্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়। উনার অসংখ্য ছাত্রের সাথে আমার ব্যক্তিগত সখ্যতা আছে—এ পর্যন্ত কোনো ছাত্রের মোটাদাগে কোনো অভিযোগ আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। এ মানুষটার ব্যক্তিত্ব নিয়ে আমি বরাবরই মুগ্ধ ছিলাম। মুগ্ধতা থেকে ভালোবাসাও ছিল। কিন্তু উপর্যুক্ত প্রশ্নের উত্তরের পর শ্রদ্ধার শীর্ষবিন্দুটা হিমালয়সমে পৌঁছেছে। স্ট্যাটাসের কমেন্টবক্সে মন্তব্যকারীদের মন্তব্যে কতটুকু কৃত্রিমতা আছে জানি না—তবে দাফনকার্য নিয়ে তাঁর আবেগঘন ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে অনেকে অশ্রুসিক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি মাছউদ কাদেরীদেরও স্যালুট জানাবেন কিনা—প্রশ্নটা আপনার বিবেকের দরবারে রাখলাম।

৫. 
মানুষ যতই মন্দ হোক, কিন্তু তার মাতা-পিতা ও গুরুর ব্যাপারে সর্বদা সংবেদনশীল। একইভাবে, গুরু যতই মন্দ প্রকৃতির হোক, তার প্রতি শিষ্যের শ্রদ্ধা এইটুকুনও কমে না। ধর্মসমূহ গুরুভক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ইসলামধর্মীয় রীতিতে পীর বা গুরু ত্যাগের নিয়ম নেই। ঊনিশ শতকের হিন্দুধর্মীয় সংস্কারক শ্রী রামকৃষ্ণ তাঁর কথামৃতে লিখেছেন, “যদ্যপি আমার গুরু শুড়িবাড়ি যায়//তথাপি আমার গুরু নিত্যানন্দ রায়।” উল্লেখ্য, গৌড়ীয় বৈষ্ণবভাষ্য অনুসারে, নিত্যানন্দ (নিতাই নামেও পরিচিত) হলেন  শ্রীকৃষ্ণের অগ্রজ বলরামের অবতার। অর্থাৎ, হিন্দুধর্মীয় রীতিনুসারেও, গুরু যদি ‘শুঁড়িবাড়ি’ যাওয়ার মতো নৈতিকতা বিবর্জিত অপরাধ করে, তবুও গুরুকে গুরু মানার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সে-জায়গায় প্রবল স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে দাফনযুদ্ধে থাকা আমার মানবিক গুরুকে নিয়ে গর্ব করাটা নিশ্চয় বাড়াবাড়ি হবে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত কারো ভালো কাজের প্রশংসা করলেও এ নিয়ে প্রকাশ্যে গর্ব করি না; পরিচিত কারো নেতিবাচক কাজের দায়ভার নিতে আমি কখনও আগ্রহী না বলে ‘দুধের মাছি’ হওয়া থেকে বিরত থাকি। কিন্তু আজ আমি সজ্ঞানে ঘোষণা করছি যে, আমি আমার গুরুকে নিয়ে গর্বিত। প্রিয় হুজুর, দয়া করে অধমের অপ্রকাশিত ভালোবাসা গ্রহণ করবেন।