বঙ্গীয় জনপদে ‘মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি’র মতো সহজলভ্য দ্রব্য হলো পরামর্শ। অতি সুলভ এসব পরামর্শের কার্যকারিতা যা-ই হোক, বড় সত্য হলো, এসব না চাইতেই পাওয়া যায়। কিন্তু বিধিবাম, বিপদে সহযোগিতা জিনিসটা মরুভূমির অসহ্য গরমে পরিশোধিত বোতলে মিনারেল ওয়াটার প্রাপ্তির মতো দুষ্পাপ্য। এখানে যেকেউ পরামর্শ বিলাতে ভালোবাসেন, সহযোগিতা প্রদানে নয়। হয়তো পুরো বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ধ্রুব। তা-ই বোধহয় ব্রাজিলীয় সাহিত্যিক পাওলো কোয়েলহো তার বিখ্যাত গ্রন্থ দি আলকেমিস্টে লিখেছেন, “Everyone seems to have a clear idea of how other people should lead their lives, but none about his or her own.” নিজে কী করতে হবে সে-বিষয়ে আমাদের পরিষ্কার কোনো ধারণা না থাকলেও অন্যজন কী পদ্ধতিতে বিশ্বজয় করতে পারবেন, তার ব্যাপারে আমরা কল্পনাতীত ধারণা রাখি। এ পরামর্শ বস্তুটির বর্তমান সময়ে হাইব্রিড রূপ হলো ‘মোটিভেশন’। বছরজুড়ে, বিশেষত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরের সময়গুলোতে ফেসবুক-ইউটিউবের পাতায় আমরা অসংখ্য ডেল কার্নেগিকে দেখি। অবশ্য ইদানীং মোটিভেশনশিল্পের এতটাই উন্নতি সাধিত হয়েছে যে, প্রেরণাদায়ী বক্তাদের পরিধি এখন ভার্চুয়াল পেরিয়ে সভা-সেমিনার পর্যন্ত বিস্তৃত। পাঠক অভিযোগের সুরে আমার মোটিভেশন বিদ্বেষের কারণ জানতে চাইতে পারে। প্রিয় পাঠক, আমি মোটেও একজন মোটিভেশন বিদ্বেষী লেখক নই। তবে মোটিভেশন নিয়ে আমার এ বিরূপ প্রবন্ধের উৎপত্তির কারণ বিশদভাবে ব্যাখ্যা দিচ্ছি।
মোটিভেশন শব্দটির খাঁটি বাংলা অর্থ হলো প্রেরণা বা প্রেষণা। উচ্চ মাধ্যমিকে মনোবিজ্ঞানের ছাত্র থাকার প্রেক্ষিতে এবং ‘প্রেষণা ও আবেগ’ শিরোনামে একটি অধ্যায় পাঠক্রমভুক্ত থাকায় এ প্রসঙ্গে আমার খানিক জানাশোনা আছে। মানুষ একটি অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য সক্রিয় থাকার পেছনে মোটিভেশন বা প্রেষণা একটি অতিশয় উপদেয় বস্তু। কিন্তু অতিরিক্ত কচকচানির ফলে অতি সুস্বাদু এ ব্যঞ্জনের স্বাদ আমার মতো অসংখ্য গোবেচারা ব্যক্তির কাছে তিক্ত হয়ে ঠেকেছে। বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদের আবিষ্কারক শ্রী হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর পাঠকনন্দিত হাস্যরসাত্মক প্রবন্ধ ‘তৈলদান’-এ তৈলকে সর্বশক্তিময় বস্তু ঘোষণা করে এর শতভাগ কার্যকারিতা স্থান-কাল-পাত্রভেদে নির্ভর করে বলেছেন। তিনি এ-সময়ে বেঁচে থাকলে ‘মোটিভেশনদান’ শিরোনামে কোনো প্রবন্ধ লিখতেন কিনা, তা জানি না—তবে তাঁর উল্লেখ করা তৈল নামক স্নেহ পদার্থটির সাথে আমি মোটিভেশনের যথেষ্ট সাদৃশ্য খুঁজে পাই। তৈলের মতো মোটিভেশনও নিঃসন্দেহে একটি অব্যর্থ অস্ত্র। কিন্তু এটির কার্যকারিতাও স্থান-কাল-পাত্রভেদে নির্ভর করে। ধরুন, কোনো হতদরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হওয়ার পরেও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে অর্থাভাবে ভর্তি হতে পারছেন না। তখন আপনি গিয়ে তাকে শুনিয়ে দিলেন কাজী নজরুল ইসলামের দারিদ্র-দুর্দশায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-বঞ্চিত হওয়ার ব্যথাহত ইতিহাস এবং গলার স্বরে যথেষ্ট গাম্ভীর্য বজায় রেখে যোগ করলেন, “নজরুলের মতো বড় কবি হতে কলেজ পড়া লাগে না।” উদাহরণটা যথেষ্ট হাস্যকর মনে হলেও আমাদের প্রাত্যহিক বাস্তবতার সাথে এর দূরত্ব তেমন বেশি হওয়ার কথা নয়। কখন কাকে সহযোগিতা করতে হবে এবং কখন কাকে বিনামূল্যে প্রেরণামূলক বক্তব্য শুনাতে হবে—এ স্থান ও সময়জ্ঞানটা আমাদের নেই বললেই চলে। ফলত আমাদের প্রেরণামূলক বয়ানের কার্যকারিতার চেয়ে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াই বেশি নেত্রগোচর হয়। বছর তিনেক আগে যে-সকল ছাত্র স্কুল পালিয়ে রবীন্দ্রনাথ হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল কোনো নিষ্কর্মা প্রেরণাবিক্রেতার বক্তব্য শুনে; আজ দেখা যাচ্ছে, তারা কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পেয়ে অন্য কোনো প্রেরণাদায়ীর বক্তব্য শুনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। তাদের এ স্বপ্ন দেখাও ধোপে টিকবে কিনা এবং শেষ পর্যন্ত এ প্রেরণাদায়ীর বক্তব্যও কতটা কার্যকর প্রমাণিত হবে, তা সময়ই বলে দেবে। অথচ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল উচ্চশিক্ষার নিমিত্তে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোর জন্য কতটা গুরুত্ববহ, তা আমরা কদাচিৎ শুনতে পাই। এর পেছনে মুখ্য কারণ হলো, কেউ ঘাটের পয়সায় মেগাবাইট কিনে এসব তিক্তসত্য শুনতে আগ্রহী না। মেগাবাইট খরচ করে দুদণ্ড অম্লমধু স্বাদের বচন না শুনলে পয়সা উসুল হওয়ার কথা না। তবে সহিহ পন্থায় সঠিক সময়ে নিঃস্বার্থভাবে সুপরামর্শ দেওয়া সৎ-মানুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয়।
এভাবে শুধু প্রেরণাদায়ীদের দোষকীর্তন গেয়ে গেলে আমাকে একচোখা দোষগ্রাহী বলাটাও অযৌক্তিক হবে না। আমি যেহেতু আজ পক্ষপাতহীন দোষজ্ঞ ত্রানকর্তা হিসেবে হাজির হয়েছি, সেহেতু ‘দুধে না ধোয়া বেগুনপাতা’ মোটিভেশন-গ্রহীতাদেরও দুকথা না শুনিয়ে রেহাই দিচ্ছি না। আমাদের প্রধান সমস্য হলো, মোটিভেশন গ্রহণের পর আমরা কাজী নজরুল ইসলামের সংগ্রামের সাথে নিজেদের লড়াইয়ের তফাৎ করতে পারি না। আমরা বেমালুম ভুলে যায়, রবীন্দ্রনাথ কিংবা আমি, দুজনেই অদ্বিতীয়। পৃথিবীতে দ্বিতীয় কোনো রবীন্দ্রনাথ যেমন নেই; আমিও তেমন দ্বিতীয়টি নেই। কাজেই, কেউ কারো সদৃশ নয়; কারো লড়াই বা জীবনপদ্ধতি কারো সাথে সদৃশ না হওয়াটাই সংগত। মহান আলেকজান্ডার যে-পদ্ধতিতে বিশ্বজয় করেছেন, সে-পদ্ধতি আমার ক্ষেত্রেও ফলপ্রসূ হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। রবার্ট ব্রুস মাকড়সার জাল বাঁধা থেকে প্রেরণা নিয়েছেন সত্য, কিন্তু লড়াই করেছেন নিজ কৌশলে। 
বলার জন্য বলতে বলতে বহু কথারই উদ্রেক ঘটেছে। উদ্বোধনীতে পরামর্শের প্রতি শোভাশূন্য ভাব স্পষ্ট থাকলেও শেষ পর্যন্ত আমার এ নিরস রচনা বোধহয় পরামর্শমূলক প্রবন্ধে রূপায়িত হলো। পাঠকবৃন্দ আমাকে ‘হিপোক্রেট রাইটার’ আখ্যা দেওয়ার আগে কেটে পড়াটা তাই সুবুদ্ধিসম্পন্ন কাজ হবে বৈকি।

[প্রবন্ধটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের Young Diplomats’ Community কর্তৃক প্রকাশিত মাসিক ম্যাগাজিন ‘বহুমাত্রিক’-এর প্রথম সংখ্যায় (জুন সংখ্যা) প্রকাশিত হয়।]