বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এ স্ট্যাটাস দিতে পারবে না, এ স্ট্যাটাস তার সাথে মানানসই না; এ ধরণের স্ট্যাটাস দেওয়া তার জন্য না-জায়েজ, এ ধরণের স্ট্যাটাস দিলে তার কবিরা গুণাহ্ হবে—এ সেন্সরশিপ বসানোর অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? আদতে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তক্, রিক্সাওয়ালা থেকে অক্সফোর্ডের শিক্ষক, চা-ওয়ালা থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী— ফেসবুকে ধর্মের বাণী প্রচার করবে নাকি খিস্তিখেউড় লিখবে— সেটা একান্ত তার ব্যক্তিগত ব্যাপার; প্রতিটি স্ট্যাটাসের স্বত্ব তার নিজের, প্রতিটি স্ট্যাটাসের দায়ভারও তার নিজের। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে হেয় করা ছাড়া যেকোনো ধরণের স্ট্যাটাস পোস্ট করার অধিকার যেকারোরই আছে। কিন্তু কোনো বিশেষজ্ঞ দল জরিপ চালিয়ে এ তথ্য পেলেও পেতে পারেন যে, দেশের সচেতন মহলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সংখ্যা এ অযৌক্তিক সেন্সরশিপের কর্তৃত্ব ফলাতে পছন্দ করেন; ন্যূনতম মৃদু সমর্থন হলেও করেন এ অহেতুক সেন্সরশিপকে। সচেতনমহল কেন ইচ্ছে করেই এ উদ্ভট সেন্সরশিপ-তত্ত্বকে সমর্থন করেন বা এর উৎপত্তিটাই আসলে কোত্থেকে—এটা জানা আমাদের জন্য ‘সময়ের দাবি’ বলা যায়। আমাদের সমাজে অদ্ভুত এক সংস্কৃতি প্রচলিত আছে—ব্যক্তির দোষ তার সম্পূর্ণ গোষ্ঠীর উপর বর্তিয়ে দেওয়া। মূলত এ অসুস্থ সংস্কৃতির চর্চা থেকে এ ধরণের উদ্ভট সেন্সরশিপ-তত্ত্বের প্রয়োজনীয়তা অনেকেই ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। একটু খোলাসা করে বলি— মনে করুন, আমি যদি কোনো মহাভারত অশুদ্ধ ধরণের কাজ করে ফেলি, তাহলে দেশের ভুঁইফোঁড় থেকে ব্যাপক সমাদিত— প্রায় সকল নিউজপোর্টালে সর্বপ্রথম আমার যে-পরিচয়টা ওঠে আসবে তা হলো, আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র। ফলশ্রুতিতে, চবির অন্য ডিপার্টমেন্টের ছাত্ররা আমার এ দোষকে মানদণ্ড ধরে আমার ডিপার্টমেন্টকে পচাবে, অন্য বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ারা পচাবে চবিকে; একইভাবে নন-পাবলিকিয়ানরা পচাবে পাবলিকিয়ানদের, পচানো হবে আমার ধর্মকে, ছাড় দেওয়া হবে না আমার অঞ্চলকে সর্বোপরি আমার দেশকে—শুধুমাত্র আমার দোষের কারণেই। এক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় সবচেয়ে বড় কোপটা পড়ে ধর্ম বা সমর্থিত মতাদর্শের উপর। বিজ্ঞ পাঠকমহলকে স্মরণ করিয়ে দিই, কোনো ভালো কাজের ক্রেডিট অবশ্যই আপনার পরিবার, আপনার ডিপার্টমেন্ট, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়, আপনার অঞ্চল, ধর্ম বা দেশ নেবে; কিন্তু কোনো খারাপ কাজের ক্রেডিট যৌক্তিক কারণে উল্লিখিত কোনো গোষ্ঠীই নিতে বাধ্য নয়, যদি-না তারা এ কাজে প্রনোদনা দিয়ে থাকেন। আপনার খারাপ কাজটার পেছনে যদি আপনার পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী না থাকে, তাহলে কেন তারা অনর্থক দোষ স্বীকার করবে? আপনার খারাপ কাজটির পেছনে যদি আপনার মতাদর্শের ন্যূনতম সমর্থন না থাকে, না থাকে কোনো ইন্ধন—তবে কেনই-বা আপনার মতাদর্শ আপনার দোষের দায়ভার নেবে? আমরা যারা ইসলাম ধর্মের অনুসারী, তাদের জন্য যেকোনো ভালো কাজ শেষে মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা অনেকটা বাধ্যতামূলক; ধর্ম মেনেই আমাদের ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলতে হয়। অন্য ধর্মের ক্ষেত্রেও এ নিয়ম থেকে থাকতে পারে, এ বিষয়ে আমার যথেষ্ট জানার ঘাটতি আছে। এ থেকে যে-বিষয়টা স্পষ্ট করতে চাচ্ছি তা হলো, ভালো কাজের ক্রেডিট সবার আগে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাকে দিতে হয়; কিন্তু কোনো খারাপ কাজের ক্রেডিট তিনিও নেবেন না। এই অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টার প্রয়োগ আমাদের সামাজিক জীবনে ঘটানোও অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে; আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমানে প্রচলিত অসুস্থ সংস্কৃতিটির পাজর ভেঙে দেওয়া। শুরুর প্রথম বাক্যটির রেশ ধরে দুটো বাক্য লিখে শেষ করতে চাই, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র কী লিখবে–কী লিখবে না, সে-বিষয়ে সেন্সরশিপ স্থাপনের মতো কথিত ‘মহার্ঘ’ সাধনের অপচেষ্টা না করে ‘ব্যক্তির দোষে গোষ্ঠীকে দোষারোপ করা’র অসুস্থ সংস্কৃতির শক্ত দেয়াল ভেঙে দেয়াটা তুলনামূলক সহজ। ‘ব্যক্তির দোষের দায়ভার ব্যক্তিকেই নিতে হবে’—এ সহজ এবং যৌক্তিক সংস্কৃতির নিরেট চর্চা শুরু করাটা যে নিঃসন্দেহে-নিঃসংশয়ে আপনার উচিত, সে-কথা নিঃসংকোচেই বলা যায়।

শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২০