গতকাল (২ ডিসেম্বর, সোমবার) দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন তাদের অনলাইন সংস্করণে মহামান্য রাষ্ট্রপতি জনাব আবদুল হামিদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে ‘দেশের মানুষ দানব হয়ে যাচ্ছে, তাদের ফেরাতে হবে’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, মাননীয় রাষ্ট্রপতি ‘খাদ্যে ভেজালকারীকে গণপিটুনি দিতে হবে’ বলে উল্লেখ করেন। গত ১ ডিসেম্বর, রবিবার রাজশাহী প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) পঞ্চম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে মাননীয় রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য আবদুল হামিদ অসংখ্য ভালো কথার মাঝে নির্দ্বিধায় অসমর্থিত ও নিন্দিত এ বাক্যটিও উল্লেখ করেন। 

গণপিটুনি বা বিচারবহির্ভূত হত্যা একটি রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। সাম্প্রতিককালে কল্লাকাটা গুজবকে কেন্দ্র করে গণপিটুনি মহামারী আকার ধারণ করেছিল। এ ইস্যুতে রাজধানীর বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে তসলিমা বেগম রানু (৪০) নামের এক নিরীহ নারীকে গণপিটুনিতে হত্যার মতো হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটে, যা দেশে প্রচণ্ড তোলপাড় সৃষ্টি করে। দৈনিক প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে গত ২২ জুলাই প্রকাশিত ‘গণপিটুনির শিকার প্রায় সবাই নিরীহ’ শীর্ষক একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টের সূত্রমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের ভেতর দেশে গণপিটুনিতে প্রাণহানির সংখ্যা ৩৬টি; যার মধ্যে চট্টগ্রামে ১৭, ঢাকায় ৯, খুলনায় ৫, সিলেটে ২, বরিশালে ২ ও রাজশাহীতে ১ জনের প্রাণহানি ঘটে। প্রসঙ্গত, গত ২২ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘ন্যাশনাল জাস্টিস অডিট বাংলাদেশ: ফলাফল উপস্থাপন ও আলোচনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, “বহু আগে থেকে প্রবাদ চালু আছে, জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড। পুরোনো এই কথার সঙ্গে নতুন একটা জিনিস যোগ করার প্রয়োজন হয়েছে। সেটা হচ্ছে, জাস্টিস ডিলেইড শুধু জাস্টিস ডিনাইড না। এখন জাস্টিস যদি ডিনাইড হয়, জাস্টিস কিন্তু বসে থাকে না। স্ট্রিট জাস্টিস চলে আসে। আমরা কিন্তু সেটা চাই না। আমরা চাই জনগণ বিচার পাক।” আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের এ বক্তব্যর চুম্বক অংশ ‘জাস্টিস ডিনাইড হলে স্ট্রিট জাস্টিস চলে আসে’-কে খোলাসা করতে গেলে বলতে হয়, রাষ্ট্র বিচার করতে অক্ষম প্রমাণিত হলেই গণপিটুনির মতো স্ট্রিট জাস্টিস চলে আসে। অর্থাৎ, গণপিটুনির প্রয়োজনীতা নিঃসন্দেহে বিচারক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অক্ষমতা প্রমাণ করে। ফলত, রাষ্ট্রপতির এ বক্তব্য বিচারক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাই বলা যায়। খাদ্য ভেজালকারীরা যতই গুরুতর অন্যায় করুক না কেন এবং প্রচলিত আইনে যদি এ গুরুতর অন্যায়ের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও থেকে থাকে, এরপরেও রাষ্ট্র নিশ্চয় জনগণের হাতে বিচারের দায়ভার তুলে দেবে না। আইন কার্যকরের জন্য রাষ্ট্রীয় বেতনভুক্ত প্রশাসন আছে; আছে নায্য বিচারকার্যের জন্য আদালত। জণগণের হাতে বিচারের ভার তুলে দিতে গেলে নিঃসন্দেহে অঘোষিতভাবে হলেও রাষ্ট্রের এ-অঙ্গসমূহ অকার্যকর প্রমাণিত হবে।

নৈতিকতা ও মানবিকতার অবস্থান থেকে বলতে গেলে প্রশ্ন তুলতেই হয়, একটি রাষ্ট্রের ‘মহামান্য’ রাষ্ট্রপতি মুক্তমঞ্চে এ ধরণের একটি বক্তব্য দিতে পারেন কিনা! এক্ষেত্রে আমরা রাষ্ট্রপতির বক্তব্যকে নিন্দা জানাতে পারবো কিনা এবং বিচারক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার কথা জোরগলায় বলতে পারবো কিনা—এ প্রশ্নদ্বয় নির্ভর করছে মূলত আরেকটি প্রশ্নের উপর: আমরা কি বর্তমানে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বসবাস করছি?