প্রয়াত আবরার ফাহাদ




এক.
সাধারণত উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত যে-সমস্ত শিক্ষার্থী অ্যাকাডেমিক পড়ালেখায় সফলতার চূড়ায় অবস্থান করে, তারাই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) অত্যন্ত কঠিন ভর্তিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করে। এদের মেধা এবং অধ্যাবসায় নিঃসন্দেহে সন্দেহাতীত। বুয়েটে কিংবা অন্য যেকোনো মহান বিদ্যাপীঠে প্রত্যেকে বিশাল স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমায়। আবরার ফাহাদ এবং তার হত্যাকারীরাও বিশাল স্বপ্ন নিয়ে বুয়েটে পড়তে গিয়েছিল; তাদের কেউ নিজে হত্যা হতে বা অন্যকে হত্যা করার নিয়তে সেখানে পড়তে যাওয়ার কথা নয়। আবরার ফাহাদ যেমন দেশের সেরা সেরা মেধাবীদের একজন, তেমনি সেরা সেরা মেধাবীদের তালিকায় হত্যাকারীদের নামও থাকার কথা। প্রশ্নটা এখানেই যে, আবরার ফাহাদকে ‘পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে’ নাকি ‘পিটিয়ে হত্যা করানো হয়েছে’? কারা তুলে দিয়েছে এ মেধাবী ছাত্রদের হাতে খুনের অস্ত্র? আপনি কোনটি চান, যারা হত্যা করেছে তাদের ফাঁসি নাকি যারা হত্যা করিয়েছে তাদের ফাঁসি?

দুই.
বুয়েট ১৭ ব্যাচের ছাত্র আবরার ফাহাদকে মারধর করা হয়েছে শিবির সন্দেহে। মনে করা যাক, এ মারধরের পরেও আবরার বেঁচে ছিল, তাহলে পুরো ঘটনাটা ক্যামন হতো, একবার চিন্তা করে দেখুন। এ বঙ্গীয় জনপদে যেহেতু সরকারের সমালোচনাকারীদের বৈধ বা অবৈধভাবে হাতুড়িসমেত পেটানো সম্পূর্ণ জায়েজ, সে-হিসেবে দেশে অঘোষিত নিষিদ্ধ একটি সংগঠন তথা ছাত্রশিবির সন্দেহে (কিছুটা আলামত প্রমাণিতও) একজনকে পেটানো নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য কাজ। আবরারকে শিবির সন্দেহে পেটানোর কাজে ব্যবহৃত ছাত্রলীগ সদস্যরা স্তুতির বন্যায় ভাসত সোস্যাল মিডিয়ায়; রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের প্রমোশনও হতো। আবরার ফাহাদকে পেটানোর রাস্তা মসৃণ একদিনে হয়নি—এর শুরুটা বেশ আগেই। কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অপরাধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তরিকুল ইসলামকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়েছিল আব্দুল্লাহ আল মামুন নামের একজনের নেতৃত্বে একদল ছাত্রলীগ সদস্য। সরকারের ভিন্নমতে অবস্থান নেওয়াদের যেহেতু নির্বিচারে পেটানো যায়, সেহেতু সে মামুনের বিচার হয়নি। তারও আগের কথা, ২০১২ সালের ডিসেম্বরে শিবির সন্দেহে কুপিয়ে হত্যা করা হয় বিশ্বজিৎ দাস নামের এক নিরীহ দর্জি ছেলেকে। আজকের খুনিরা সেসব ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়নি বলে কি কেউ হলফ করে বলতে পারবে? বরঞ্চ তারা খুব ভালোভাবেই বুঝেছিল যে, তরিকুল ইসলাম কিংবা আবরার ফাহাদদের হাতুড়িপেটা করলে বিচার হয় না, মেরে ফেললেও হয়তো হবে না।

তিন.
শিবির বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিতর্কিত একটি সংগঠন। এ সংগঠনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী ও সহিংসতামূলক বিভিন্ন ঘটনার অভিযোগ আছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানকে প্রত্যক্ষ সমর্থন দানকারী জামাতে ইসলামীর সহযোগী ছাত্র সংগঠন হিসেবে এ সংগঠনের অভ্যুদয়। রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর এমন কোনো কার্যক্রমে শিবির সদস্যরা জড়িত থেকে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রশাসনের কাজ। কিন্তু এ দেশে অলিখিতভাবে শিবির পেটানোর দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হয়েছে ছাত্রলীগের হাতে। তারা অবাধভাবে শিবির পেটাতে পারবে, পিটিয়ে মেরেও ফেলতে পারবে! এই লেখাটা পড়তে পড়তে অনেকে ভাবতে পারেন, আমি সম্ভবত শিবিরের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করছি। বলাটা হয়ত অপ্রাসঙ্গিক যে, আমি ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে একজন সুফিপন্থী; সুফিপন্থীরা জামাত-শিবিরের আজম্ম শত্রু। সুফি মতাদর্শী অনেক আলেম এবং ব্যক্তিবর্গের  উপর শিবির জন্মলগ্ন থেকে হামলা চালিয়ে এসেছে এবং অনেককে হত্যাও করেছে। জামাত-শিবিরের সাথে আওয়ামীলীগের দ্বন্দ্ব রাজনৈতিক হলেও সুফিপন্থীদের সাথে জামাত-শিবিরের দ্বন্দ্ব দু ধরণের— আকিদাগত (creed base) ও রাজনৈতিক। ধর্ম বিষয়ক যাদের ন্যূনতম জানা-পড়া আছে, তারা এ বিষয়ে অবশ্যই অবগত থাকবেন। এরপরেও আমি কখনও শিবিরকে পিটিয়ে মারার পক্ষে না, কোনো বোধ সম্পন্ন মানুষ এর পক্ষাবলম্বন করতে পারেও না। কিন্তু, বিচারহীনতার সংস্কৃতি পিটিয়ে মারাকে বৈধতা দিয়েছে।

চার.
আবরার হত্যার পেছনে আর যা-ই হোক, মূল মোটিভ হলো সরকারের সমালোচনা। এটি বঙ্গীয় জনপদে সবচে’ ভয়াবহ কাজ। নিজেদের অন্ধকার দিক চাপা দিতে তারা চর্চা করছে বহু বছর ধরে প্রবহমান বিচারহীনতার সংস্কৃতি; তৈরি করেছে সরকারের সমালোচনা মানেই দেশদ্রোহিতা রব তোলার উদ্ভট থিওরি। তারা দিয়েছে নিজ মতাদর্শের বাইরে যাওয়াদের পিটিয়ে  মারার অবাধ স্বাধীনতাও।
আইসিটি বিভাগের উদ্ভাবন তহবিলের অনুদানের আওতায় ২০১৫ সালে সরকার কর্তৃক একটি অনলাইন গোষ্ঠী অনুদান পেয়েছিল (পরে সোস্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে বাতিল হয়)। তাদের মূলত যে কাজটি ছিল তা হলো, আওয়ামীলীগ মতাদর্শের বাইরে সকলকে ‘রাজাকার’ ট্যাগ দেওয়া এবং অলেখ্য-অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা। তারা সৃষ্টি করেছিল অনলাইন ত্রাস, ছড়িয়েছিল সোস্যাল মিডিয়াভর্তি ঘৃণা। সাধারণ ইসলামিস্টদের তারা ‘ছাগু’ বা ‘ছুপা ছাগু’ বলে গালিগালাজ করত; আর বামপন্থী রাজনীতির অনুসারীদের উপাধি হিসেবে ‘বামাতি’ শব্দের উৎপত্তি ঘটিয়েছিল। মোদ্দাকথা, আওয়ামী মতাদর্শ থেকে ‘পান হতে চুন খসার’ মতো অবস্থা হলেই তাদের গালি-তাণ্ডব শুরু হতো। কে বা কারা ছিল তাদের পৃষ্ঠপোষক? 

পাঁচ.
আমি আবরারের হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই না। উপর্যুক্ত কারণেই চাই না। আমি ফাঁসি চাই তাদের, যারা বিচারহীনতার সংস্কৃতির চর্চা করে যাচ্ছে, যারা পিটিয়ে হত্যার রাস্তা বাধাহীন করেছে; আমি ফাঁসি চাই তাদের, যারা ৯ জন আবরার ফাহাদের হাতে তুলে দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে সমালোচনা করার দায়ে আরেক আবরার ফাহাদকে হত্যা করার অস্ত্র। আমি ফাঁসি চাই তাদের, যারা দেশটাকে অবাসযোগ্য করে তুলছে শুধু নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে। আমি ফাঁসি চাই তাদের, যাদের পেছনে আপনারা সম্মানে-শ্রদ্ধায় কিংবা ভয়ে ‘মাননীয়’ ট্যাগ ব্যবহার করেন।