বিশ্বকাপ শুরুর পূর্বে লিখেছিলাম ‘স্বপ্নচূড়ায় উনিশ’; ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বিশ্বকাপের পর লিখতে হচ্ছে ‘স্বপ্নভঙ্গের উনিশ’! অথচ, এমন তো হওয়ার কথা ছিল না। ‘কেন এমন হলো’ প্রশ্নের উত্তরে হয়ত এক শব্দে বলা যাবে ‘পরিকল্পনাহীনতা’। কেন টিম ম্যানেজমেন্ট ইংল্যান্ডের মতো পেস বান্ধব কন্ডিশনে মাত্র দুজন স্ট্রাইক বোলার নিয়ে খেলতে নেমেছেন অধিকাংশ ম্যাচ, কেন বারবার অকার্যকর প্রমাণিত ট্যাকটিসে পরিবর্তন আনা হলো না, সেসব বিষয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করার জায়গা ছাত্রবার্তার ‘ক্রীড়াঙ্গন’ না-হলেও একথা নির্ভীক চিত্তে বলা যায়, বোলিংয়ে এমন ভয়ঙ্কর ভরাডুবির কারণ দুজন স্ট্রাইক বোলার নিয়ে খেলতে নামার মতো বিরাট ভুল সিদ্ধান্তই। বলাই বাহুল্য, বিশ্বকাপ নিয়ে দেশের কোটি ক্রিকেট সমর্থকের সযত্নে আশার সুতোয় বুনা স্বপ্ন ভেঙে দেওয়ার কারণ নির্বিষ বোলিং এবং ফিল্ডিং।
এ বিশ্বকাপে ৯ ম্যাচের মধ্যে বাংলাদেশ খেলতে নেমেছে ৮টি ম্যাচ, বৃষ্টিতে ভেসে গিয়েছে ১টি। ৩ জয় ও ৫ হার নিয়ে টেবিলের অষ্টম স্থানে অবস্থান করে টুর্নামেন্ট শেষ করেছে বাংলাদেশ; দশ দলের মধ্যে তাদের নিচে আছে কেবল ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আফগানিস্তান।বাংলাদেশ দল এর আগে অংশ নেওয়া পাঁচ বিশ্বকাপেও যে খুব বেশি অর্জন নিয়ে এসেছিল তা না, কিন্তু প্রত্যাশা ও শক্তিমত্তা বিচারে সদ্য প্র‍য়াত কোচ স্টিভ রোডসের শিষ্যদের এবারের পারফর্মেন্স নিছক ‘ভরাডুবি’ বলে মূল্যায়ন না করলে অবিচার হতে পারে। স্বপ্নভঙ্গের এ বিশ্বকাপের আক্ষেপ, হতাশা, প্রাপ্তি এবং প্রত্যাশাগুলোকে নান্দনিক (?) কিছু শিরোনামে আজকের আলোচনায় আপনাদের সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করবো।

…শেষটা হতে পারত আরও সুন্দর!
এবারের আক্ষেপের অনেকটাই মাশরাফি মোর্তজাকে ঘিরে। দুরন্ত গতিতে ক্যারিয়ার শুরু করা মাশরাফির পা সার্জনের ছুরিতে বারবার ক্ষত-বিক্ষত হলেও এতদিন একবারের জন্যও ‘ছুরিকাঘাত’ লাগেনি তাঁর পারফর্মেন্সে। অথচ সে-ই মাশরাফি ক্যারিয়ার-সায়াহ্নে এসে কতটা অসহায় আর নির্জীব! বিশ্বকাপ শুরুর পূর্বে অধিনায়ক হিসেবে খেলতে নামা তাঁর ৭৭ ম্যাচে উইকেট ছিল ৯৭; বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর ম্যাচ সংখ্যা ৮৫ হলেও উইকেট বেড়েছে মাত্র ১টি! অর্থাৎ, অধিনায়ক হিসেবে উইকেটের সেঞ্চুরিটাও হলো না বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে। প্রতিটি ম্যাচে মাঠে নামলেও দশ ওভারের কোটা পূরণ করেননি একবারও; ৩৬১ গড়ে উইকেট নিয়েছেন ১টি, ইকোনমি রেট ছিল ৬.৪৪! কিংবদন্তি মাশরাফিকে দেখে ক্রিকেটকে মনে-প্রাণে ভালোবাসা কোনো বর্ষীয়ান সমর্থকও হয়ত নিজের অজান্তেই বলে ওঠবেন, ‘ক্রিকেট, তুমি এত নিষ্ঠুর কেন?’

হতাশার নাম তামিমের ব্যাটিং ও মুশফিকের কিপিং
প্রত্যাশা যেখানে বাস্তবে যথাযথ রূপ পায় না, সেখানে আসে হতাশা। কাজেই, যাঁদের নিয়ে প্রত্যাশার পর্বত হিমালয়সম ছিল, হতাশা তো তাঁদের ঘিরে হওয়ার-ই কথা।
নিঃসন্দেহে সকলে এক বাক্যে স্বীকার করে নেবে যে, দেশের ক্রিকেটে এ পর্যন্ত খেলা ওপেনারদের মধ্যে তামিম ইকবাল খাঁন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও সর্বোৎকৃষ্ট। তিনি প্রমাণিতও বটে। তবে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ রানের মালিক বরাবরের মতো এ বিশ্বকাপেও ফ্লপ। পুরো টুর্নামেন্টে ২৯ গড়ে রান করে নিজেই নিজেকে স্তুতিবাক্যে ভাসিয়ে নিজের জনপ্রিয়তাকে আত্মাহুতি দেওয়া এবং হাস্যরসের খোঁড়াক হওয়া যায় হয়ত; কিন্তু বহুজাতিক টুর্নামেন্টে নিজেকে প্রমাণ করতে না পারলে বাঘা বাঘা আন্তর্জাতিক ব্যাটসম্যানদের দৌঁড়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আর যা-ই হোক, টিকে থাকা যায় না। নিচের র‍্যাঙ্কের দলগুলোর সঙ্গে খেলে ৪ বছরে ওপেনারদের প্রতিযোগিতায় শীর্ষ অ্যাভারেজ ধরে রাখার চেয়ে বিশ্বকাপে বড় দলগুলোর বিপক্ষে রান পাওয়া কঠিন তো বটে, সে-সাথে কিংবদন্তিদের তালিকায় নাম লেখাতে এটা অপরিহার্যও বলা যায়। টানা ৪ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া তামিম হয়ত নিজের ক্যারিয়ারের সর্বশেষ সুযোগটাই প্রহেলিকায় হারিয়েছেন। আগামী ৪ বছর পর তাঁর পারফরমেন্সের পারদ ওঠবে-কি-নামবে, সে উত্তর আমার কাছে নেই; কিন্তু এটা তো ধ্রুব যে, ততদিনে তাঁর বয়স আরও চার বছর বাড়বে।
তামিম-সৌম্যের ওপেনিং পার্টনারশিপের মতো ব্যর্থতার কাঠগড়ায় আরেক অভিযুক্ত আসামি মুশফিকুর রহিমের কিপিং। ব্যাটসম্যান হিসেবে যতটা নির্ভরযোগ্য মুশফিক, কিপার হিসেবে তার চেয়ে বেশি ভয়াবহ ব্যর্থ তিনি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ম্যাচটি আপনি দেখে থাকলে এ বিষয়ে আমাকে আর বিস্তারিত লিখতে হবে না। মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়; কিন্তু একই ভুল যখন কেউ বারবার করে, তখন সেটা আর ভুল থাকে না, অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ দলে বিকল্প হিসেবে লিটন দাস ছিলই। পুরো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের বোলিং-ফিল্ডিংয়ের মতো মুশফিকের ‘কিপিং’ দর্শনও ছিল সমান কষ্টদায়ক।
প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়ে হতাশ করেছেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, নিজের প্রথম বিশ্বকাপে খেলতে নামা ভবিষতের ঝাণ্ডাবাহী মেহেদী মিরাজ ও মোসাদ্দেক হোসেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বকাপ খেলতে নামা সৌম্য সরকার।

প্রাপ্তির নাম সাকিব কিংবা গুটিকয়েক ব্যক্তিগত অর্জন
ব্যক্তিগত অর্জনকে প্রাপ্তির শেষ ধরে নেওয়া ও অল্পতেই তুষ্টির ঢেকুর তুলা ব্যক্তিদের চোখে ‘সাকিব-ই আমাদের বিশ্বকাপ’ হলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দল না জিতলে ব্যক্তিগত অর্জনগুলো প্রাণহীন কিংবা মূল্যহীন। টুর্নামেন্ট শেষে খোদ সাকিব আল হাসানের কণ্ঠেই ঝরেছে হতাশার বাক্যবাণ।
এটা অবশ্য সবাই দেখেছে যে, দলগত পারফর্মেন্সে বাংলাদেশ যতোটা নিষ্প্রভ, সাকিব ছিল ঠিক ততটাই উজ্জ্বল। সমগ্র টুর্নামেন্টে নিজের আলোতে দলের অন্ধকার ঢাকা দিয়ে নিজের জাত চিনিয়েছেন বিশ্ব দরবারে। রেকর্ড করা ও ভাঙার মধ্য দিয়ে সাকিব ছাড়িয়ে গেছেন নিজেকে, স্থান করে নিয়েছেন সর্বকালের সেরাদের তালিকায়, সারবস্তু হয়ে ওঠেছেন লন্ডনের ‘দ্যা টেলিগ্রাফে’র মতো পত্রিকার। তবে ব্যাটিংয়ে সাকিব সাধ্যের অতিরিক্ত দিলেও বোলিংয়ে নিজের জায়গা থেকে সাকিবকে পুরোপুরি সফল বলা যায় না। আফগানিস্তানের ম্যাচটি বাদ দিলে বাকি ৭ ম্যাচে ৬১.৬৭ গড়ে সাকিবের শিকার ৬ উইকেট! তবে এটাও তো সত্য যে, সাকিবও মানুষ, ভিনগ্রহের কোনো এলিয়েন নন।
ওডিআইতে সোনার হরিণ খ্যাত ২টি ফাইফার এবং ২৪.২০ গড়ে ২০ উইকেট নিয়ে বোলারদের শীর্ষ পাঁচে অবস্থান করলেও বিশ্বকাপের প্রতিটা ম্যাচ পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করা দর্শকদের চোখে বুমরাহ-শাহীনদের মতো তারুণ্যের দৌঁড়ে পিছিয়ে আছেন বাংলাদেশের বোলিং-অঙ্গের প্রাণ ভ্ৰমর মুস্তাফিজুর রহমান। বিশ্বকাপে তাঁর ইকোনমি রেট দেখে চোখ রাঙানোর মতো, সংখ্যায় লিখলে যা ৬.৪৪!
একজন স্টক বোলার হিসেবে সাইফউদ্দিনকে যে স্ট্রাইক বোলারের রোল প্লে করার মতো অতিমানবীয় কিংবা অমানুষিক কাজ করতে হয়েছে এবং সে-কাজে যে তিনি মোটামুটি হলেও সফল, এ-কারণে ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট সকলের পক্ষ থেকে তাঁর অন্তত এক টুকরো ধন্যবাদ পাওয়ার কথা। ৩২.০৭ গড়ে ও ওভার প্রতি ৭.১৮ রান দিয়ে ১৩ উইকেট সংগ্রহ নিঃসংশয়ে তাঁর প্রতি প্রত্যাশার তুলনায় অধিক।
সম্পূর্ণ টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের ব্যাটিং অবশ্য সামান্য হলেও স্বস্তিদায়ক ছিল। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা শতক হাঁকিয়েছে ৩টি (সাকিব ২টি, মুশফিক ১টি), অর্ধশতক হাঁকিয়েছে মোট ১১টি; বলাই বাহুল্য, সাকিবের অর্ধশতক সংখ্যা মোটের তুলনায় অর্ধেকের বেশি।

টন্টনে লিটনের ‘মোনালিসা’ অঙ্কন, নাভিশ্বাসে সাইফের স্নায়বিক ক্ষমতা প্রদর্শন এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ
আমরা, বাঙালিরা আশায় বুক বাঁধতে ভালোবাসি। তাই শেষ করবো আশা কিংবা প্রত্যাশার কতক বাক্য শুনিয়ে। বর্ষীয়ান এবং কিংবদন্তি ক্যারিবিয়ান ধারাভাষ্যকার ইয়ান বিশপ যখন টন্টনের কমেন্ট্রি বক্স থেকে স্তুতিভরা কণ্ঠে বলে ওঠেন, ‘লিটন দাস ইজ পেইন্টিং এ মোনালিসা উইথ হিজ ব্যাট হয়ার ইন টন্টন’ কিংবা ভারতের বিপক্ষে শেষ সময়ে এসে নিঃসঙ্গ যোদ্ধার মতো সাইফের হারের আগে হার-না-মানা অপ্রতিরোধ্য অর্ধশতক এবং স্নায়ু চাপকে জয় করে বিশ্বের এক নম্বর বোলারের বলকে হাঁকানো একের-পর-এক দর্শনীয় বাউন্ডারি আমাদের চোখে ভাসিয়ে তুলে অন্যরকম বাংলাদেশের এক সুখকর চিত্র; যেখানে লাল-সবুজের জার্সি পরা একদল টগবগে তরুণ উঁচিয়ে ধরেছে সোনালী রঙের ট্রফিটা। যথাযথ পরিচর্যা ও পরিকল্পনা লিটন-সাইফদের হাত ধরেই বাংলাদেশকে পৌঁছে দিতে পারে সে-অদূর স্বপ্নবন্দরে। সে-পর্যন্ত আমাদের নিরেট সমর্থন দেওয়া ছাড়া কী-বা করার আছে!

৪ বছর পরে আবার আরেকটি বিশ্বকাপ। ২০২৩ সালে বিশ্বকাপের ত্রয়োদশ সংস্করণ ভারতের মাটিতে আয়োজিত হবে বলে উপমহাদেশের দেশগুলোর জন্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত থাকবে। সে-হিসেবে বাংলাদেশের সামনেও হয়ত সমান সুযোগ থাকবে। কিন্তু স্বপ্নের শীর্ষে অবস্থান করা আরেকটা উনিশ কি ফিরে আসবে? ক্রিকেট ইতিহাসে আরেকটু গাঢ় হয়ে থাকার জন্য অপরিহার্য ‘ম্যান অফ দ্য ওয়ার্ল্ডকাপে’র ট্রফিটা কি সাকিবকে বাংলাদেশ এনে দিতে পারবে? কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারকে ভারত বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিল; আমরা অন্তত কিংবদন্তি সাকিবের জন্য সেমিফাইনাল খেলতে পারিনি। হায়! স্বপ্নভঙ্গের উনিশ, তোমাকে কি কোনোভাবেই ইতিহাস হতে মুছে দেওয়া যায় না?