এক.
চলমান এইচএসসিতে পরীক্ষার হলে দায়িত্বপালন করা বেশিরভাগ কলেজ শিক্ষকদের আচারণে বিস্মিত হওয়া ছাড়া অপশন পাচ্ছি না। উত্তরপত্রের জন্য বরাদ্ধকৃত ওএমআর শিটদ্বয়ের কাভার পেইজে রোল নাম্বার, রেজিস্ট্রেশন নাম্বার, বিষয় কোড ও সেট কোড পূরণের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকে। পাশাপাশি উপস্থিতিপত্রে এমসিকিউ ও ক্রিয়েটিভ প্রশ্নের জন্য দেওয়া উত্তরপত্রদ্বয়ের ক্রমিক নম্বর যথাযথভাবে লিখে স্বাক্ষর করতে হয়। পরীক্ষা শুরুর প্রথম ত্রিশ মিনিটে ‘বহুনির্বাচনী’ নির্বাচনের মতো কাজের টানটান সময়ে এগুলো যে লোহাগলা চাপের সমান, তা যেকোনো পাবলিক পরীক্ষায় একবারের জন্য অংশগ্রহণ করা ব্যক্তির পর্যন্ত বোঝার কথা। কলেজ শিক্ষকগণ যেহেতু এসব স্তর পার করেই এসেছেন, সেহেতু তাঁদের আরও ভালোভাবে বিষয়টা অনুধাবন করতে পারাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই প্রত্যক্ষদর্শী হচ্ছি, এসব বিষয়ে হালকা কিছু ভুলের জন্য শিক্ষকদের তীর্যক বাক্যবাণের। এমন ভুল হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে বলেই এ ব্যাপারে বিকল্প ব্যবস্থা আছে। এতে করে শিক্ষকদের কিছু ঝামেলার সম্মুখীন হয়তো-বা হতে হয়; কিন্তু এসব ঝামেলা একটা ছেলের সম্পূর্ণ জীবন নষ্ট হয়ে যাওয়ার তুলনায় অতি নগণ্য। উপরন্তু, আরেকটু খোলাসা করে বলতে গেলে, এসব ঝামেলার ঝক্কি পোহানোর প্রস্তুতি নিয়েই শিক্ষকদের এক্সাম হলে আসা উচিত। কারণ, নিঃসন্দেহে এটা তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। তবে বর্তমানে তাঁদের অভাবনীয় দায়িত্ব পালন দেখে সকলেই নির্দ্বিধায় বলার ক্ষমতা রাখে যে, এটা নিছক তাঁদের পার্টটাইম জব। সামান্য এসব ঝামেলা এড়নোর জন্য ছাত্রদের কী পরিমাণে কটু কথা তাঁরা শুনিয়ে থাকেন এবং তার পরিণামে উক্ত ছাত্রের উপর পরীক্ষা চলাকালীন কী পরিমাণ মানসিক প্রভাব পড়ে থাকে—তা আসলে ভুক্তভোগী না হলে বুঝে ওঠার তেমন সম্ভাবনা নেই। এক্সাম হল নামক রণক্ষেত্রে ঘণ্টা তিনেকের জন্য এসব চাপ মোকাবেলায় যে একজন ছাত্রকে যোদ্ধায় পরিণত হয়, তা অন্তত শিক্ষকদের বোঝার কথা।
অবশ্য এ ধরণের শিক্ষকের সংখ্যা খুবই সীমিত। বেশিরভাগই দায়িত্বে অভিষ্ট থাকেন মনেপ্রাণে। গত পরশু পরীক্ষায় আমি বিষয় কোড ইংরেজিতে ওয়ান-জিরো-নাইন লেখার পরিবর্তে বাংলায় এক-শূন্য-নয় লেখায় কিছুটা ভীত হয়েছিলাম। দায়িত্ব পালনরত শ্রদ্ধেয় শিক্ষিকাকে অবগত করতেই তিনি মুচকি হাসি দিয়ে মাথা দুলিয়ে আশ্বস্ত করলেন, ‘এটা কোনো ব্যাপরই না, বাবু।’ যদিও আমি মোটামুটি দুয়েকটা কটু কথা শোনার ব্যাপারে প্রস্তুতই ছিলাম। তাঁর প্রদত্ত ফিডব্যাকে আমি পুরোটাই অবাক হয়েছিলাম। সত্যি বলতে কী, একটা মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার জায়গাটা তৈরি হতে বেশিকিছুর প্রয়োজন পড়ে না।
কতিপয় বিপদগ্রস্ত ছাত্রদের জন্য যদি সকল ছাত্রকে একই বাটখারায় মাপা হয়, তবে কি কিছু মনুষ্যত্বহীন শিক্ষকের জন্য আমরাও সকল শিক্ষককে একই ওজনে মাপবো?

দুই.
ফেনীর সোনাগাজীতে নুসরাত জাহান রাফি নামের এক আলিম পরীক্ষার্থীকে আগুনে দগ্ধ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় পুরো দেশ তুলপাড়। হত্যাকাণ্ডের মূল আসামী হিসেবে চিহ্নিত উক্ত মাদ্রাসার অধ্যক্ষ লম্পট সিরাজুদ্দৌলাসহ অসংখ্য ব্যক্তি রয়েছে অভিযুক্তদের তালিকায়।

তিন.
উপর্যুক্ত দুটি ঘটনার একটা জায়গায় মিল আছে—দেশের সবকিছুর সাথে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষকদের অধঃপতনও নিশ্চিত হচ্ছে। ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে শিক্ষকদের মনুষ্যত্ব ও বিবেক; লোপ পাচ্ছে বিচারবুদ্ধি ও আত্মসম্মানবোধ। আগে যেখানে শিক্ষকদের শ্রদ্ধা ও সম্মানের গুডাউনের সাথে তুলনা করা হতো, বর্তমানে তাঁরা (কিছুকিছু) এখন চাটুকারিতার খনি। চাটুকারিতা বিষয়টা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি থেকে প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক পর্যন্ত এসে যেতে খুব বেশি দেরি লাগেনি। কড়ি কড়ি টাকা, সাথে রাজনৈতিক শক্তিতে বলীয়ান—স্বভাবতই মনুষ্যত্ব বিষয়টা না থাকলেও চলে। সততার তেজ কমার সাথে ব্যস্তানুপাতিক হারে বাড়ছে টাকা, রাজনৈতিক শক্তিমত্তা ও চাটুকারিতার পরিমাণ। আগেকার দিনে নাকি অস্ত্রবাহী সন্ত্রাসী বানিহী পর্যন্ত শিক্ষকদের দেখলে তাদের বন্দুক যথাসম্ভব লুকিয়ে সাময়িক আলাভোলা টাইপের বিনয়ী হয়ে যেতেন! এসব গল্প আমি শুনেছি আমার শিক্ষকদের মুখে—তবে এসব এখন অনেকটাই প্রাচীন গ্রিকের মিথ। কতিপয় বা মতান্তরে ছাত্রদের বিশাল একটা অংশ শিক্ষকদের সম্মান দিচ্ছেন না বলে যে সত্য অভিযোগ প্রচলিত আছে, তার দায়ভারও কি এসব শিক্ষকরা এড়াতে পারবেন?

চার.
নুসরাত নির্মমভাবে খুন হয়েছে। তিতু শোনালেও সত্য, এটা স্রেফ একটা ইস্যু। বড়জোর ৫ ফিট বাই ৩ ফিটের ব্যানারে কিছু লোকের হৈচৈ টাইপ কিছু বক্তব্য পত্রিকায় আসবে—এগুলোকে খুব সম্ভবত ‘মানববন্ধন’ বলে। তবে এসব মানববন্ধনে ব্যক্তির ব্যক্তিগত ফায়দা বা রাজনৈতিক ফায়দা ওঠানো ছাড়া তৃতীয় কিছু থাকে না। কারণ, আমরা তো নিজ চোখেই দেখলাম, সড়ক আন্দোলনের মতো এত বড় আন্দোলন কীভাবে ধুলিসাৎ হলো। হবে না-ই বা কেন, ক্ষমতাসীন সরকার বাহদুরের গণ্ডারের চামড়ার কাছে এসব আন্দোলন কিছুই না। সরকার সয়ে নিয়েছে, আমরা ধীরে ধীরে সয়ে নিচ্ছি—একটু সময় লাগছে, এটাই পার্থক্য।
আচ্ছা, আবরাবের নামে ফ্লাইওভারটা কি হয়েছে? ছাত্রদের এক সপ্তাহ পর মাঠে নামার অবস্থা কী?
নুসরাতকে কেন্দ্র করে কিছু কি-বোর্ড যোদ্ধাও ফায়দা ওঠাবে, কলামিস্টরাও তাদের ঝালিয়ে নিবেন; আমরা যারা ম্যাঙ্গো পিপল, আমরা নিজেদের সমস্ত ঝাঁজ ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে ঝাড়বো; এরপরে আসবে, ওকে হিরো বানানোর গল্প, তাকে ভিলেন বানানোর গল্প— কারণ, মূল ঘটনা চাপা দিতে এ ছোটখাটো বিষয়গুলো যথেষ্ট। এগুলোই পলিটিক্স। সাঈদী পুত্র ইতোমধ্যে দাবি করে ফেলেছেন, জামাতপন্থী অধ্যক্ষ সিরাজের বিচার হলেও হচ্ছে না একই সাথে জড়িত লিগের রুহুল আমিনের বিচার। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, হুজুররা কেন এর বিরুদ্ধে মাঠে নামছেন না; আবার কেউ কেউ প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন, নারীবাদীরা কেন নামছেন না। পরবর্তী ইস্যু পর্যন্ত আপাতত টপিক এগুলোই। কিন্তু কেউ মূল ঘটনায় হাত দেয় না। কেউ একথা বলছে না, স্বাধীনতার চেতনাপন্থী রুহুল আমিনের সাথে জামাতপন্থী অধ্যক্ষ সিরাজের কেন সখ্যতা? চার/পাঁচটা মামলার আসামি একজন জামাত কীভাবে স্বাধীনতার পক্ষের একজন মানুষ পরিচালনা পর্ষদে থাকা অবস্থায় অধ্যক্ষ পদে আসীন থাকে? তাহলে সাধারণ মানুষের আবেগের পুঁজিতে কেন এই চেতনা ব্যবসা? মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকদেরই-বা কেন এ অবনতি?

পাঁচ.
গতকালের অর্থনীতি দ্বিতীয় পরীক্ষায় প্রশ্ন এসেছে, ‘খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় কি একান্তই সরকারের? তোমার উত্তরের স্বপক্ষে যুক্তি দাও’—দেখে হাসলাম। বইতে পড়েছি, সাধারণ জনগণ বা এনজিও-গুলোরও কিছু দায়িত্ব আছে। গদি রক্ষার রাজনীতিতে যখন সরকার দল ব্যস্ত, তখন তো জনগণকেই এসব মোকাবেলা করতে হবে। সচেতনাতা নিজ থেকেই শুরু হতে পারে। সেদিন জিইসিতে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় আমার সাথে থাকা বন্ধুরা বলল, ‘পাগল হৈছস নাকি? এতদূর দিয়ে যাচ্ছিস ক্যান? আর জেব্রা ক্রসিং দিয়ে পার হয়েও তো আবরার রক্ষা পাইনি।’
তাদের কথা ঠিক। ল্যাংটার দেশে প্যান্টস পরা মানুষটাই পাগল। আর তর্কে যাইনি। অগত্যা তাদের কথা মেনে নিলাম।
কিন্তু পরিবর্তন তো নিজে থেকে শুরু হতে পারে। গণ্ডারের চামড়াদারী ক্ষমতাহীন সরকার বাহদূর যখন নিজ গদি রক্ষার্থেই কেবল সক্রিয়, বাকিসবে যা-তা, তখন তো নিজেদেরই এগুতে হবে টিকে থাকার সংগ্রামে। দুনিয়া আমাদের জন্য চিরশান্তির স্থান না। কিন্তু বর্তমানে যে অবস্থাতে আছি, সে অবস্থাতেও অবশ্য থাকার কথা ছিল না। একটা মানুষ পৃথিবীতে চিরমুক্তি পাবে না। খেয়াল করে দেখলাম, একটা মানুষের জীবনে যতটুকু সংগ্রাম দ্বারা আচ্ছাদিত, সে মানুষ তত বেশি সফল। সংগ্রাম করুন, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, চাটুকারিতার বিরুদ্ধে, মনুষ্যত্বহীন দস্যুদের বিপক্ষে—তবে সেটা ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক ফায়দার জন্য না। তাহলে আপনিও তাদের দলে চলে যাবেন। নুসরাত আমাদেরকে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সংগ্রাম করে যাওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন; সে শিক্ষা গ্রহণ করুন, প্লিজ। সবচেয়ে বড় সংগ্রাম তো নিজেকে শুধরানো।

চৈত্র ৩০, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ